শারদীয় পুনর্জন্ম : উৎসবের ভেতরে মানুষের আলো খুঁজে পাওয়ার গল্প
খায়রুল আনাম
প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৯
•
অনলাইন সংস্করণ
শারদীয় দুর্গাপূজা বাঙালির জীবনে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি একধরনের বার্ষিক আত্ম-উৎসব। বছরের অন্য সময়গুলোতে জীবন যতই ব্যস্ত, ক্লান্ত বা অনিশ্চিত হোক—আশ্বিনের আকাশে যখন প্রথম সাদা তুলোর মতো মেঘ ভেসে ওঠে, তখন মনে হয় পৃথিবী একটু থেমে গেছে। একটা নরম আলো নেমে আসে মনোজগতে। একটা অদৃশ্য ডাক শোনা যায় : ‘চলো, আবার শুরু করি।’
আমার নিজের জীবনে দুর্গাপূজা এসেছে তিনটি ভিন্ন ভূখণ্ডের চার ভিন্ন রূপে—কলকাতার উচ্ছ্বাসে, পাকিস্তান-পর্বের দূরত্বে, বাংলাদেশের নীরবতায় আর আমেরিকার বহুসংস্কৃতির মেলবন্ধনে। এই চার রূপ মিলেই আমার পূজার স্মৃতি আজ এক অদ্ভুত, বহুস্তরীয়, গভীর অভিজ্ঞতা।
কলকাতার পূজা : প্রথম যৌবনের আলো ও উচ্ছ্বাস
আমার প্রথম যৌবন কেটেছে কলকাতায়—এক শহর যেখানে দুর্গাপূজা শুধু উৎসব নয়, একধরনের সামাজিক উন্মাদনা। সেই বয়সে আমি ছিলাম এক অদম্য পথিক। দুর্গাপূজার সময় শহরটা যেন আমার সামনে খুলে যেত। এক প্যান্ডেল থেকে আরেক প্যান্ডেল—শিয়ালদহ, বাগবাজার, কুমারটুলি পার্ক, কলেজ স্ট্রিট, মোহাম্মদ আলী পার্ক, চেতলা অগ্রণী ক্লাব, দেশপ্রিয় পার্ক, শোভাবাজার ও অন্যান্য—আমি হাঁটতাম, দেখতাম, বিস্মিত হতাম।
সেই সময়ের কলকাতার পূজা ছিল একধরনের জীবন্ত শিল্প। বাঁশের কাঠামো, রঙিন আলো, থিমের সৃজনশীলতা, ঢাকের তালে তালে কাঁপা বাতাস—সবকিছুই ছিল এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাসের জগৎ। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে রাতভর ঘোরা, চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে পূজার রাজনীতি নিয়ে তর্ক, আর প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে সেই নীরব বিস্ময়—আজও মনে হয়, যৌবনের সেই পূজা আমাকে জীবনের প্রথম বড় আনন্দের পাঠ দিয়েছে।
কলকাতার পূজা আমাকে শিখিয়েছে—উৎসব মানে মানুষের মিলন, আলো আর একসঙ্গে থাকার আনন্দ।
পাকিস্তান-পর্ব : উৎসবের দূরত্ব ও সামাজিক বাস্তবতা
কলকাতা থেকে ইমিগ্রেশন করার পর আমার পরবর্তী জীবন শুরু হয় পাকিস্তানে—তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে। সেই সময়ের সামাজিক পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুর্গাপূজা সেখানে ছিল না, সে কথা না বলা চললেও শুধু দূরবর্তী, সামাজিকভাবে প্রায় অদৃশ্য একটি উৎসব ছিল। উৎসাহ, উদ্দীপনা বা আগ্রহ তৈরি হওয়ার মতো তেমন কোনো পরিবেশই ছিল না।
একজন তরুণ হিসেবে আমি তখন নতুন দেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম। সেই সময় দুর্গাপূজা আমার জীবনে একধরনের বিরতি, একধরনের অদৃশ্য অনুপস্থিতি হয়ে দাঁড়ায়। এই পর্বটি আমাকে শিখিয়েছে—উৎসবের অভিজ্ঞতা শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি সামাজিক পরিবেশের ওপরও নির্ভর করে।
বাংলাদেশের পূজা : নীরবতা, দূরত্ব আর রাষ্ট্রপরিবর্তনের ছায়া
তারপর এল বাংলাদেশের জন্ম। দেশটি তখনো ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার অপেক্ষায়। রাষ্ট্রপরিবর্তনের উত্তাল সময়, সামাজিক পুনর্গঠন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে উৎসবের পরিবেশ তখনো ঠিক দানা বেঁধে উঠতে পারেনি।
আমি তখনো দুর্গাপূজার মণ্ডপে যাইনি। কারণ সামাজিক পরিমণ্ডল যাচ্ছিল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। কমিউনিটি তখনো গড়ে ওঠেনি, মানুষ তখনো নতুন রাষ্ট্রের পরিচয় পাওয়া নিয়ে ব্যস্ত। ওই ফ্লুইড অবস্থার মধ্যে আমি ইমিগ্রশন নিয়ে আমেরিকায় চলে আসি।
আজ ভাবলে মনে হয়—বাংলাদেশের সেই সময় আমার জীবনে পূজার অনুপস্থিতির দ্বিতীয় অধ্যায়। একধরনের নীরবতা। একধরনের দূরত্ব। একধরনের অদৃশ্য শূন্যতা। কিন্তু সেই শূন্যতাও আমাকে একটা শিক্ষা দিয়েছে—উৎসব শুধু বাহ্যিক নয়; উৎসবের আসল রূপ মানুষের সম্পর্কের ভেতরে।
আমেরিকার পূজা : বহুসংস্কৃতির ভিড়ে বাঙালির শিকড়কে খুঁজে পাওয়া
১৯৭৪ সালে আমি আমেরিকায় চলে এলাম। সেই সময় দক্ষিণ এশীয় মানুষের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। হিন্দু-মুসলমানের আলাদা কমিউনিটি তখনো গড়ে ওঠেনি। দুর্গাপূজা বা ঈদের নামাজ—সবই ছিল ছোট পরিসরে, নীরবে, সীমিত মানুষের অংশগ্রহণে।
কিন্তু সময় বদলেছে। আজ আমেরিকার শহরগুলোতে দক্ষিণ এশীয় মানুষের উপস্থিতি বেশ দৃশ্যমান। এখন ঈদের নামাজ হয় বড় হলে, পার্কে, ব্যাংকোয়েট হলে, কমিউনিটি সেন্টারে। বাঙালি হিন্দুরা দুর্গাপূজা করেন জোরেশোরে—প্রতিমা আসে, ঢাক বাজে, অঞ্জলি হয়, সিঁদুর খেলা হয়। অবাঙালিরা কালীপূজা করেন, নাইট অফ লাইট পালন করেন—একধরনের বহুসংস্কৃতির উৎসবের মেলবন্ধন এখন তৈরি হয়েছে।
আমেরিকার পূজা আমাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে—এখানে পূজা মানে শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটা নিজের শিকড়কে ছুঁয়ে দেখার সময়। এটা নিজের পরিচয়কে আবার নতুন করে অনুভব করার সময়।
প্রবাসের পূজায় মানুষ আরও বেশি করে একে অপরকে খুঁজে পায়। কারণ এখানে উৎসব মানে স্মৃতি। এটা মানে শৈশবের কলকাতা। এটা মানে পাকিস্তান-পর্বের দূরত্ব। এটা মানে বাংলাদেশের নীরবতা। এটা মানে নিজের ভেতরের আলোকে আবার জ্বালিয়ে তোলা।
দুর্গা : মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে জয়ের প্রতীক
দুর্গার মহিষাসুর বধের গল্পটি আমি সব সময়ই দেখেছি একধরনের মানবিক প্রতীক হিসেবে। এটি মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে জয়ের গল্প—ভয়, হতাশা, একাকিত্ব, লোভ, ক্রোধ, অহংকার—যে অন্ধকার আমাদের প্রতিদিনের জীবনে নানা রূপে এসে দাঁড়ায়।
দুর্গা আমাদের মনে করিয়ে দেন—শক্তি বাইরে নয়, শক্তি ভেতরে। সাহস বাইরে নয়, সাহস ভেতরে। আলো বাইরে নয়, আলো ভেতরে।
এই ধারণাটি পৃথিবীর প্রায় সব বড় দর্শনেই আছে—কখনো তা শক্তির প্রতীকী রূপে, কখনো তা অন্তরের সংগ্রামের ভাষায়, কখনো তা নৈতিক উন্নতির পথে।
মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে জয়ের এই সর্বজনীন সত্যই দুর্গাপূজাকে ধর্মীয় সীমার বাইরে এনে এক মানবিক উৎসবে পরিণত করে।
বিজয়া দশমী : বিদায়ের মধ্যেও আশার আলো
বিজয়া দশমীর সিঁদুরে লাল হয়ে থাকা মুখগুলোতে এক অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি থাকে—আনন্দ, বিষাদ, স্মৃতি, আর এক অদৃশ্য প্রতিশ্রুতি।
দুর্গা বিদায় নেন, কিন্তু তিনি আমাদের ভেতরে রেখে যান—একটা আলো, একটা সাহস, একটা নীরব শক্তি।
আমরা জানি—তিনি আবার আসবেন। আর বাঙালিরা আবার প্রস্তুত হব তাকে বরণ করতে।
শেষ কথা : পূজা আসলে আমাদের ভেতরের পুনর্জন্ম
শারদীয় দুর্গাপূজা আমার জীবনে দেখা দিয়েছে চার রূপে—কলকাতার উচ্ছ্বাসে, পাকিস্তান-পর্বের দূরত্বে, তখনকার বাংলাদেশের নীরবতায়, আর আমেরিকার বহুসংস্কৃতির মেলবন্ধনে। এই চার রূপ মিলেই আমি বুঝেছি—পূজা আসলে বাহ্যিক নয়; পূজা আমাদের ভেতরের আলো জ্বালানোর সময়। পূজা আমাদের সম্পর্কগুলোকে নতুন করে সাজানোর সময়। পূজা আমাদের ব্যক্তিগত যুদ্ধগুলোকে নতুন করে লড়ার সাহস দেওয়ার সময়।
দুর্গা আসেন বছরে একবার, কিন্তু তিনি বাঙালিদের ভেতরে থাকেন সারা বছর—শক্তি হয়ে, আলো হয়ে, আশ্রয় হয়ে। এটাই শারদীয় দুর্গাপূজার আসল অর্থ—বাঙালিদের ভেতরের পুনর্জন্ম।
লেখক : প্রকৌশলী ও পরিবেশবিদ। দীর্ঘ পেশাজীবনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায় সমানভাবে সক্রিয়।